দৃষ্টিহীন হেনা

avatar

শাহিন মুখ ভার করে তার ছাদ বাগানে বসে আছে। সে অনেকক্ষণ ধরে তার মন খারাপ হওয়ার কারণটা বুঝতে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছে না। সবেমাত্র সূর্য অস্ত গিয়েছে, শরতের শেষে এবং হেমন্তের শুরুতে এই দিন আর রাতের মাঝামাঝি সময়টা কেমন জানি অদ্ভুত, আগেও শাহিন লক্ষ্য করেছে এই সময়টাতে সে হাজার চেষ্টা করেও মন ভালো রাখতে পারে না। এটা কি একান্তই তার সমস্যা নাকি সবার ক্ষেত্রে ঘটে!

এই ছাদ বাগানটা শাহিনের খুবই প্রিয়। ঢাকা শহরে বেশ কিছু সৌখিন বাড়িওলা রয়েছে যারা ছাদে বাগান করে থাকেন। শাহিনদের বাড়িওয়ালী তাদের মতই একজন। সত্যি বলতে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি ভালো। অনেক বাড়ির মালিক রয়েছেন যাদের ছাদে ওঠার ব্যাপারে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা থাকে কিন্তু এখানে তা নেই। শাহিনের ক্ষেত্রে তো আরও নেই কারণ সে ছাদেই থাকে। না, খোলা আকাশের নিচে নয়! ছাদে যে চিলেকোঠা থাকে সেখানেই সে একটি রুম ভাড়া নিয়েছে। এই ছাদ বাগানটায় যদিও বেশ কিছু ফলের গাছ রয়েছে তবে ফুলের গাছের প্রাধান্য বেশি। বাড়িওয়ালী ফুল পছন্দ করেন তাই নানান ফুলের গাছ দিয়ে তার এই বাগানটা সাজিয়েছেন।

A330AFDE-8663-4662-964C-E22FD1FA336D.jpeg

হেনা খুব দৃঢ় অথচ ধীর পায়ে শাহিনের দিকে এগোচ্ছে। ঠিক শাহিন যেখানে বসে আছে তার থেকে এক হাত সামনে এসে স্থির হয়ে গেলো এবং খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল-

—আপনার মনটা কি বেশি খারাপ?

শাহিন কোন উত্তর দিল না কারণ মন ভাল হতে শুরু করেছে এবং সে তার মন খারাপ হওয়ার কারণটা ধরতে পেরেছে। হেনাকে সে আজ সারাদিন দেখেনি। এই মেয়েটার একটা অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি রয়েছে, মুহূর্তের মধ্যেই মন ভালো এবং খারাপ দুটোই করে দিতে পারে।

হেনা শাহিন থেকে ঠিক ৮ ইঞ্চির মতো দূরত্ব রেখে পাশে বসলো। শাহিনের মাঝে মাঝে মনে হয় হেনা বোধহয় চোখে দেখে। সে শুনেছে অন্ধদের এক ধরনের বিশেষ অনুভূতি রয়েছে যা কিনা দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন মানুষদের নেই, তাই বলে এতটা প্রখর ক্ষমতাসম্পন্ন অন্ধ কাউকে শাহিন ইতিপূর্বে দেখেনি।

এই মেয়ের অনুভূতি এতটা প্রখর যে সে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে শাহিন তাকে পছন্দ করে। শাহিনের আত্মভিমান বা আত্মসম্মান যেটাই বলি না কেন একটু বেশি, এই যে তার তিন কুলে কেউ নেই এটা নিয়েও সে নিজের উপর যারপরনাই বিরক্ত। আজ যদি তার মা বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই হেনার মাকে সে তার ছেলের ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব দিতেন! পরক্ষণেই সে চিন্তা করল এর উল্টোটাও তো হতে পারতো! কারণ কোন মা তার ছেলের জন্য অন্ধ বউ পছন্দ করবে না; হোক না সে যত সুন্দরী অথবা বাড়িওয়ালির মেয়ে! তাহলে কে তার মনের কথা পৌঁছাবে এই মেয়েটার কাছে?

শাহিন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি ভালো বেতনে চাকরি করে কিন্তু তারপরও এখানে পড়ে রয়েছে এই চিলেকোঠায়। সে চাইলেই একটা ভালো মানের ফ্ল্যাটে উঠতে পারে কিন্তু হেনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতরটা কেমন জানি চিনচিন করে ওঠে। এই যে অনেকক্ষণ ধরে হেনা তার পাশে বসে আছে অথচ দুজনে একটি কথাও বলছে না, শাহিন যে নিজের ভেতর ডুবে থাকতে পারে এবং পছন্দ করে এটা হেনা ভাল করেই জানে, তাই তাকে খুব বেশি বিরক্ত করে না।

শাহিন সারা জীবন তাকে বুঝতে পারে এমন কাউকে খুঁজেছে আর তার চাওয়ার মানুষটি এখন তার হাতের নাগালে কিন্তু কিসের একটা অদৃশ্য বাধা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, কিছুতেই তাকে প্রকাশ করতে দিচ্ছে না!! শাহিন আত্মমগ্ন হয়ে থাকার পাশাপাশি ২০ মিনিট ধরে মনের শক্তি সঞ্চয় করেছে, আজ সে কিছু বলবেই। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে, আবছা আলোয় হেনার মুখটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছে, এটাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ সময় কিছু বলার। যদি কোনো কারনে সে রিজেক্টেড হয় তাহলে হেনার মুখের অভিব্যক্তি সে বুঝতে পারবে না। কারণ ওই মুখাবয়বে তার প্রতি তাচ্ছিল্য সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবেনা।



0
0
0.000
0 comments